।।স্মৃতির আকাশে হাওড়ামারী হাই স্কুল।।

স্মৃতির আকাশে হাওড়ামারী হাই স্কুল

কালোমানিক (প্রাক্তন ছাত্র)

“বর্ষে বর্ষে  দলে দলে    আসে বিদ্যামঠ তলে

চলে যায় তারা কলরবে,”

কবিতাটি যখন পড়তাম, ভাবতাম বিদ্যামঠ হতে চলে যেতে আমার এখনও অনেক দেরি। সময় দ্রুতগামী।আজ থেকে ১৭ বছর আগে অনেকের মত আমি ও মাধ্যমিক পাশ করে “তাদের” দলে যোগ দিয়ে স্কুল ত্যাগ করেছিলাম। স্কুলের প্রতিটি দিন, প্রতিটি বছর কেটেছিল একরকম কলরবে, সৃষ্টি হয়েছিল অনেক স্মৃতির – এখন বুঝতে পারি। স্মৃতি গুলো মেঘহীন রাতের আকাশের তারাদের মত মিটমিট করে, আর কিছু কিছু স্মৃতিরা শুকতারা বা ধ্রুবতারার মত একটু বেশি জ্বল জ্বল করে। স্মৃতির অ্যালবাম থেকে স্কুল বাড়িটির ছবিটি টেনে বার করলে দেখতে পাই শুরুর দিকে ইংরেজি L অক্ষরের মতো একটা সাদা রঙের দোতলা বাড়ি, তার নিচের তলায় একটা দিকে অফিস এবং টিচার্স রুম। অফিস টির দুটি দরজা যার একটি দিয়ে প্রবেশ করলে দেখা যেত সাদা কালো অল্প চুল আর পাতলা দাড়ি মুখে, চোখে চশমা এঁটে টেবিলে কতগুলো কাগজ আর হাতে কলম নিয়ে বসে আছেন স্কুলের হেড স্যার সামসুল আলী লস্কর, অন্য দরজা দিয়ে ভিতরে দৃষ্টি দিলে দেখা যেত দপ্তরীর টেবিল পেরিয়ে দূরে কাঁচা পাকা চুল ও গোঁফ নিয়ে, বাদামি রঙের ফ্রেমের চশমা চোখে বসে স্কুলের প্রধান করণিক যিনি সমস্ত শিক্ষক দের বিশ্বাস দা আর আমার বাবা। বাবা স্কুলের কেরানি হওয়ায় আমার এবং আমার ভাই বোন দের স্কুলে বেশ কিছু সুবিধা হতো বৈকি : প্রত্যেক বছরে নুতন ক্লাসে ভর্তি, মার্কশিট নেওয়া, বুকলিস্ট নেওয়া এই সমস্ত অফিসের কাজ গুলির জন্য অফিসের সামনে লাইনে দাঁড়াতে হতো না। যে সুবিধাটিতে সবচেয়ে বেশি খুশি হতাম সেটি হলো কখনো স্কুলে অনুপস্থিত থাকলে পরের দিন অভিভাবক এর থেকে চিঠি আনতে হতো না, বাবা টিচার এর সঙ্গে কথা বলে নিতেন। স্কুল বাড়িটির সামনে লম্বা লম্বা মেহগনি গাছের সারিটি ও L এর মত আকার নিয়েছিল। গাছের সারির ঠিক পর থেকে অফিসের দিকে মুখ করে প্রতিদিন স্কুল শুরুর আগে প্রার্থনার জন্য লাইন দেওয়া হতো। প্রার্থনা চলা কালীন যারা স্কুলে এসে পৌঁছাত তারা মুখে একটু ভয় আর অনুতাপের ছাপ নিয়ে দলবদ্ধ ভাবে প্রার্থনা সারি থেকে দূরে স্কুল বাড়ির প্রান্তে অপেক্ষা করতো। আমাদের স্কুলের প্রার্থনা গান কখনো জাতীয় সঙ্গীত ছিল না, তার বদলে গাওয়া হতো দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের “ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা…” শোনা যেত স্বাধীনতার পূর্বে অর্থাৎ ইংরেজ দের সময়ে “জনগণমন অধিনায়ক..” লেখা হয়েছিল বলে স্কুলের হেড স্যার “সকল দেশের সেরা… আমার জন্মভূমি” কে প্রাধান্য দিতেন প্রার্থনা গান হিসেবে। উত্তরে অফিসের ঠিক পিছনে এখন যেখানে জীবনতলা রোকেয়া মহাবিদ্যালয় সেখানে বর্ষায় ধান আর শীতে সব্জি চাষ হতো। কয়েক বছর পর যখন স্কুল পরিসরের দক্ষিণ দিকে দ্বিতীয় স্কুল বাড়িটি গড়ে উঠলো, পিছনের মাঠে মাটি ফেলে উঁচু করা হলো আর তার দরুন দূরে মাঠের ঈশান কোণে একটা দীঘি খনন হলো। মনে পড়ে একবার ক্লাসের এক বন্ধু একটা লাল রঙের ক্যামেরা এনেছিল আর আমরা বেশ কয়েকজন ঐ দীঘির জলে নেমে ছবি তুলতে গিয়ে প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলেছিলাম। নুতন স্কুল বাড়ি তৈরির সাথে সাথে স্কুল পরিসর টি একটি মস্ত পাঁচিল দিয়ে ঘেরা হয়েছিলো। পরিসরের দক্ষিণ পূর্ব কোণে পাঁচিলের ঠিক ভিতরে ছিল এক বিশাল আশ্চর্য তেঁতুল গাছ। আশ্চর্য্য এই জন্য যে সেই গাছের তেঁতুল কখনো পাকতো না, আর তার কারণ তেঁতুল ফলতে শুরু করলেই নীল সাদা সাজে হনুমানের দল টিফিনের ফাঁকে খুব উপদ্রপ করতো। স্কুলের ইউনিফর্ম ছিল ছেলেদের জন্য সাদা শার্ট আর নীল প্যান্ট, ক্লাস এইট পর্যন্ত মেয়েদের জন্য সাদা টপ আর নীল স্কার্ট, ক্লাস নাইন থেকে টুএলভ পর্যন্ত নীল পাড়ের সাদা শাড়ী। খুব সুন্দর একটি ব্যাজ ছিল যেটাতে একটি সূর্য্যোদয়ের ছবির উপরে “শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড” লেখা ছিল। আক্ষেপ এর বিষয় এই যে আমরা ছাত্র ছাত্রীরা এতটাই অবাধ্য ছিলাম যে কখনো ব্যাজ পরতাম না। কেবল আমাদের উপরের ক্লাসের এক দাদা কে দেখতাম প্রতিদিন ব্যাজ পরে আসতে, সে এতটাই ব্যতিক্রম ছিল যে আমার এখনো মনে আছে।

তেঁতুল গাছে আক্রমণ, শীত কালে ক্রিকেট খেলা ছাড়া টিফিনের অবসরে অনিবার্য এবং আকর্ষক ছিল বারিক দার মশলা মুড়ি। ছোট্ট একটি ঠেলা দোকান, চারিদিকে মুগডাল, চানাচুর, বিস্কুট ইত্যাদির প্যাকেট ঝুলছে, টেবিলের উপরে কাঁচের জারে রাখা আছে আরও কতো মুখোরোচক খাবার। ঠিক টিফিনের সময় ঐ ছোট ঠেলাটিকে কেন্দ্র করে ভিড় করে থাকতো ক্ষুধার্ত তরুণ তরুণীর এক বিশাল ঝাঁক। মাঝে বারিক দা একা দাড়িয়ে আর তার হাত দুখানা মেশিনের মতো চলছে। একটা বড়ো পাত্রে বেশ কিছুটা মুড়ি তারপর তাতে একে একে চানাচুর, ঝুরি ভাজা, বাদাম ভাজা, কুচি করে কাটা পেয়াজ, কাঁচা লঙ্কা, আর সবশেষে সর্ষের তেলের বোতলটি কে উপুড় করে তার ছিপি র মাঝের ছোট ছিদ্রটি দিয়ে পিচকারীর মত করে তেল দেওয়া সেই বড়ো পাত্রে। উঃ তার মশলা মুড়ি বানানো দেখতে দেখতে চোখ জুড়িয়ে যেত, অপেক্ষা করতে বিরক্তিবোধ হতো না আর বারিক দা কে হিরো মনে হতো। তৈরি হলে ছোট ঠোঙায় ভরে দিতে গেলে একসাথে চার – পাঁচ টা হাত এগিয়ে আসতো। ২ টাকার মশলা মুড়ি তখন ছোট ছোট পেট গুলো ভরানোর জন্য ছিল যথেষ্ট, তবে পেট বা ঠোঙা ছোট হলেও তখন ২ টাকা, তার মূল্য আজকের দিনের মত হারায়নি। মাসুদ, আজাহারউদ্দিন, সালাউদ্দিন, ওমর ফারুক এরা ছিল আমার মেলা ক্লাসমেট তথা বন্ধুবর্গ দের মধ্যে বেশি ঘনিষ্ঠ। টিফিনের সময় টুকু মশলা মুড়ির ঠোঙা হাতে সাইকেলের উপর বসে জল্পনা বা কখনো মাঠে গোল গোল ঘুরে পায়চারিতে সঙ্গ দিতাম এদের। তখন টিফিনের জন্য পয়সা দেওয়ার ব্যাপারে স্কুলের কেরানী আয়ুব আলী বিশ্বাস একেবারেই শিথিল ছিলেন না। বাড়ি থেকে স্কুলে বেরোনোর সময় আমাকে কখনো টিফিনের পয়সা দেওয়া হতো না কাজেই টিফিনের সময়ে বাবার অফিসে গিয়ে তাঁর থেকে ২ টাকা চেয়ে আনতে হতো। কখনো বাবা ব্যস্ত থাকলে বা অফিসে না থাকলে সেদিন টিফিনের পয়সা পেতাম না, আর দয়ালু বন্ধুদের বাবারা স্কুলের কেরানী ছিলেন না বলে বোধ করি, না খেয়ে থাকতে হতো না। পরে একসময় বারিক দার প্রতিযোগীদের আগমন হলো এবং আরো পরে বারিক দা কে আর স্কুলে মশলা মুড়ি বেচতে দেখা যায়নি।

উত্তরমুখো নুতন স্কুল বাড়িটির সামনে একটু ডান পাশে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো দুটি তালগাছ, তাদের উপর ভর করে বাঁশ ও টিন দিয়ে বানানো ছিল সাইকেল রাখার জন্য একটি ছাউনী। এই ছাউনীটি এতটাই ছোট ছিল যে, স্কুল চলাকালীন দুই স্কুল বাড়ির মাঝে দাঁড়িয়ে চারিদিকে চোখ বোলালে দেখা যেত স্কুল বাড়ির বারান্দা গুলো রংবেরঙের সাইকেলে ঠাসা। সাইকেল গুলো যেনো একে উপরের ঘাড়ে জড়িয়ে দারুন নিস্তব্ধতায় বিশ্রাম নিতে নিতে একটু ঘুমিয়ে পড়ত আর অন্তিম ঘণ্টা পড়ার পর তীব্র শোরগোলে আচমকা জেগে যেত। অফিস আর টিচার্স রুমের সামনে বারান্দায় সাইকেল রাখা নিষেধ ছিল। টিচার্স রুমের দিকে আমাদের সচরাচর যাওয়া হতো না। টিচার্স দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভয় পেতাম সামসুদ্দিন সরদার কে, ইনি সবার কাছে সেকেন্ড স্যার নামে পরিচিতি ছিলেন। সেকেন্ড স্যার অর্থাৎ সেকেন্ড হেড স্যার, আমরা তাঁকে SS স্যার ও বলতাম। যখন ধীরে ধীরে উঁচু ক্লাসে উঠেছিলাম তখন ভয় কমে গেছিল। আমাদের সবচেয়ে প্রিয় টিচার ছিলেন সন্দীপ মাঝি, আমরাও তাঁর প্রিয় ছাত্র ছাত্রী ছিলাম সেটা আমি বলতে পারি। সন্দীপ স্যার আমাদের ইংরেজি পড়াতেন। পরে ভালো ইংরেজি পড়াতেন তন্ময় মন্ডল। তবে আমাদের সবার ইংরেজি টিউশন টিচার ছিলেন রশিদ স্যার। বিজ্ঞান বিভাগের বিষয় গুলির টিউশনের জন্য প্রদীপ স্যার আর সালাউদ্দিন স্যার ছিলেন। স্কুলে খুব ভালো ভূগোল পড়াতেন কুমুদ রঞ্জন মন্ডল স্যার। ইতিহাসে,  ফিজিক্যাল ট্রেনিং এ আর ভালো গল্প বলাতে ছিলেন নজরুল স্যার। পরে রণজিৎ স্যার আর রেখা ম্যাডাম ফিজিক্যাল ট্রেনিং ক্লাসের দায়িত্বে ছিলেন। সায়রাপ স্যার ইতিহাসে, জনাব স্যার এবং মোত্তালিব স্যার বিজ্ঞানে আর বড়দি মানে মিনু দে ম্যাডাম ছিলেন বাংলা সাবজেক্টে। মিনু দে কেনো যে বড়দি নামে সবার কাছে পরিচিত ছিলেন তা আমার ঠিক জানা ছিল না, দীর্ঘ্য দিন যাবত স্কুলে কেবল একটাই ম্যাডাম ছিলেন- মিনু দে।

আমার স্কুল জীবনে শক্ত পোক্ত প্রতিযোগী ছিল তাজমিরা মোল্লা, আমাদের এই পড়াশোনার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছিল সেই প্রাইমারি স্কুল থেকেই। শুধু পরীক্ষায় কে সবচেয়ে বেশি নম্বর পাবে তা নয়, কে প্রতিদিন প্রতিটি সাবজেক্ট এর পড়া করে আসছে, কে ক্লাসে সবচেয়ে বেশি শান্ত এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ, ক্লাসে রেসপন্স এবং পারফরম্যান্স এর মাধ্যমে কে বেশি টিচার্স দের প্রিয় হতে পারছে – মোট কথা কে বেস্ট! তাজমিরা সম্পর্কে আমার মামাতো বোন, বেশ মনে পড়ে আমার নানি অর্থাৎ তাজমিরার ঠাকুমা যখন আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসতেন আমি তাঁর কাছে খোঁজ নিতাম তাজমিরার পড়াশোনার রুটিনের ব্যাপারে, আর উত্তরে নানি প্রত্যেকবার বলতেন সে তো সারাক্ষণ বই নিয়ে বসে থাকে, নানির এই উত্তর আমার চাপ বাড়িয়ে দিত।

স্কুলে আমার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় ছিল বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা যেটা শীত কালে কোন এক সময় হতো। কয়েকদিন ধরে চলতো আর ছেলে মেয়েরা অংশ নিতো বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক খেলায়- দৌড়, দীর্ঘ লম্ফন, উচ্চ লম্ফন, অঙ্ক দৌড় ইত্যাদি। একবার ক্লাস ফাইভ এ অঙ্ক দৌড় প্রতযোগিতায় অংশ নিয়েছিলাম আর মনে আছে যোগ অঙ্কটাই ভুল করেছিলাম। তবে ‘মিউজিক্যাল চেয়ার‘ আর ‘যেমন খুশি তেমন সাজো‘ এই দুটি প্রতিযোগিতার জনপ্রিয়তা ছিল সবচেয়ে বেশি। আশে পাশের গ্রাম থেকে শিশু, বয়স্ক সবাই দেখতে আসতো এই খেলা গুলো। সবাই মিলে মাঠ টাকে ঘিরে প্রতিযোগিতা স্থল কে কেন্দ্র করে একটা বৃহৎ বৃত্ত তৈরি করত। পুরো প্রতিযোগিতা টি পরিচালনা করতো টিচার্স রা আর সঙ্গে থাকতো স্টুডেন্ট স্বেচ্ছাসেবীর দল। তখন বেশ মনে হতো স্বেচ্ছাসেবী হতে পারলে অনেক মজা, কারণ দেখতাম টুপি পরিহিত স্বেচ্ছাসেবীরা বাড়তি মনোযোগ পেত।

এখন শুনি যোগ হয়েছে আরো কত স্কুল বাড়ি
উন্নতির রেখা যায় বুঝি দেখা দীর্ঘ্য সীমানা ছাড়ি।
বর্ষে বর্ষে আসে নুতনেরা সংখ্যায় তারা অতি
দীর্ঘ পাঠ শেষে স্মৃতি কুড়ায়ে প্রস্থানে সমগতি।
সেই তাল গাছ হয়তো বুড়ো আজ
নুতনের কাছে শান্ত সে তেতুঁল গাছ,
কতো মাষ্টার মশাই গেছে অবসরে
আজও বাঁচে তারা স্মৃতিতে ভর করে।
কেহ বা গেছে চলি এই স্কুল আর ইহলোক ছাড়ি
শুভ্র বর্ণে একা থাকে দাঁড়িয়ে পুরনো সে স্কুল বাড়ি।
ভুলিবনা কভু সেই বেঞ্চ, ব্ল্যাকবোর্ড ও চকের খড়ি
আনমনা হলে নিভৃতে বসি স্মৃতি খানি দেখিব নাড়ি।

Comments

One response to “।।স্মৃতির আকাশে হাওড়ামারী হাই স্কুল।।”

Leave a comment